আরো সংবাদকৃষক দলজা. ওলামা দলজাসাসতাঁতী দলবিএনপিমতামতমহিলা দলমুক্তিযোদ্ধা দলমৎস্যজীবী দলযুব দলশ্রমিক দলস্বেচ্ছাসেবক দল

‘যেমন দেখেছি শফিউল বারী বাবুকে’

মোঃ হারুন-অর-রশিদ

‘তিনি মরে গেছেন কিন্তু বেঁচে আছেন লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীর হৃদয়ে। তিনি আর কেউ নন; জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবু। মানুষ মরণশীল। যার জন্ম হয়েছে তার মৃত্যু অবধারিত।

পবিত্র কুরআনুল কারিমের সূরা আল ইমরানের ১৮৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘কুল্লু নাফসিন যাইক্বাতুল মাউত।’ কিন্তু কিছু মৃত্যু আছে যা দেহের প্রস্থান হয় মাত্র; তবে তার কীর্তি তাকে চিরজীবনের জন্য জগৎ সংসারে বাঁচিয়ে রাখে।

মানুষ তাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে অনন্তকাল। শফিউল বারী বাবু তেমন একজন নেতা। মাত্র একান্ন বছর বয়সে সারা দেশের লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মীকে কাঁদিয়ে ২৮ জুলাই, ২০২০ তারিখ ভোর চারটায় জাতীয়তাবাদী আদর্শের এই অগ্র সৈনিক না ফেরার দেশে চলে গেছেন।

তার মৃত্যুতে তার নিজ হাতে তৈরী করা লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মী শোকে মুহ্যমান।

আদর্শের রাজনীতিতে আপোসহীন, অত্যন্ত সাহসী এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্বদানের অধিকারী এই নেতার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বিএনপির রাজনীতিতে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে তা পূরণ হবার নয়। তিনি ছিলেন সেরা সংগঠকদের অন্যতম।

ছাত্র রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে সাংগঠনিক নেতৃত্বের বিচক্ষণতা, দৃঢ়তা ও আপসহীনতা তাকে রাজনৈতিক প্যারামিটারের এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল।

সকল স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তার ছিল বলিষ্ঠ প্রতিবাদী ভূমিকা। বিশেষ করে ১/১১‘র সময়ে ফখরুদ্দিন, মঈনউদ্দীনের অবৈধ মাইনাস রাজনীতির বিরুদ্ধে তার সাহসিক ভূমিকা ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে একটি আলাদা অধ্যায় সৃষ্টি করেছিল।

মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে মৃদুভাষী শফিউল বারী বাবু নেতাকর্মীদের কথা খুবই মনোযোগ দিয়ে শুনতেন; কথা খুবই কম বলতেন। সিদ্ধান্তের বেলায় বুঝা যেত তিনি কত বড় মাপের সংগঠক ছিলেন।

তার মেধা ও বিচক্ষণতা এবং বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতাই তাকে একজন সত্যিকারের রাজনৈতিক সংগঠকে পরিণত করেছিল।

তিনি কর্মীদের কাছে এতটাই প্রিয় ছিলেন যে, তার বর্ণনা দিতে গিয়ে ছাত্রলীগের এক নেতা তার ফেইসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘তার সকল সদস্যই তার জন্য বুলেটের বিপরীতে বুক পেতে দিতে এতটুকু কুন্ঠাবোধ করত না।’

আমার সাথে এই মহান নেতার ঘনিষ্ঠতা বাড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট নির্বাচনের প্রাক্বলে। তিনি ওই নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন।

আমি উনার হলের (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল) ছাত্র এই কারণে আমাকে অনেক বেশি আদর করতেন এবং ওই নির্বাচনে আমাকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও দিয়েছিলেন।

তখন থেকেই যখন দেখা হতো সালাম বিনিময় করলেই তার জবাব দিয়ে কেমন আছিস জিজ্ঞেস করতেন।

২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর শফিউল বারী বাবুকে সভাপিত ও আব্দুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েলকে সাধারণ সম্পাদক করে স্বেচ্ছাসেবক দলের ৭ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করলে আমি স্বেচ্ছাসেবক দল করতে আগ্রহী হই।

সাইফুল ইসলাম ফিরোজ ভাই (সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক) এই কমিটিতে থাকায় আরোও বেশি আগ্রহী হই। যদিও জাসাসের তরফ থেকে দপ্তর সম্পাদকের প্রস্তাব ছিল।

কিন্তু আমি স্বেচ্ছাসেক দল করব এই প্রস্তাব ফিরোজ ভাইকে বলার পর তিনি বাবু ভাইয়ের কাছে পাঠিয়ে দিলেন।

স্বেচ্ছাসেবক দল করব শুনে বাবু ভাই খুব খুশি হলেন। কিছুদিন পরেই দপ্তরে কাজ করার জন্য দায়িত্ব দিলেন।

দপ্তরে কাজ করার সুবাদে ভাইয়ের সাথে ঘনিষ্ঠতা আরো বেশি বৃদ্ধি পায়। আমি লেখালেখি করি এটা তিনি খুব পছন্দ করতেন। মাঝে মাঝে কিছু উপদেশও দিতেন।

দপ্তরে দায়িত্বপালনরত অবস্থায় ২০১৮ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারী ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হই। কারাগারে গিয়ে প্রিয় নেতা আব্দুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, ইয়াছিন আলী সহ অসংখ্য নেতাকর্মীর সাক্ষাৎ পাই।

মার্চের ৬ তারিখে মিন্টুরোডস্থ ডিবি অফিসে তৃতীয় বারের মত রিমান্ডে গেলে শুনতে পাই বাবু ভাই গ্রেফতার হয়েছেন। সংবাদটা শুনেই বুকের মধ্যে একটা চাপ সৃষ্টি হলো।

মনে মনে ভাবতে লাগলাম মিছিলের শ্লোগানে ম্যাডামের মুক্তি চেয়ে ‘আমার নেত্রী আমার মা বন্দী থাকতে পারে না’ রাজপথে এই শ্লোগান দেওয়ার আর কেউ থাকল না। যাই হউক উনাকেও ডিবি অফিসে নিয়ে আসা হলো।

তিন দিনের রিমান্ড শেষে একই দিনে আলাদা আলাদা পুলিশ প্রিজন ভ্যানে করে কোর্টে নেওয়া হলো। কোর্ট থেকে সোজা কারাগারে। তারপর কারাগারে প্রতিদিনের কত স্মৃতি চোখের সামনে জ্বল জ্বল করছে।

প্রতিদিন সকাল-বিকাল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দীদের আবাসস্থল যমুনা থেকে সূর্যমুখীতে ছুটে যেতাম ভাইয়ের সাথে দেখা করার জন্য। গেলেই বিস্কিট, ফল খেতে দিতেন।

সুবিধা অসুবিধা জিজ্ঞেস করতেন। সেখানেও আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন জেলের মধ্যে কারা কারা কষ্টে আছে তাদের লিস্ট করার জন্য।

কারা আইনের সুবিধা পাচ্ছে না, জামিন হচ্ছে না, টাকার অভাবে উকিল নিয়োগ দিতে পারছে না, কার বাসায় খাবার নেই, ছেলে-মেয়েদের স্কুলের বেতন দিতে পারছে না তাদের লিস্ট করে দিলে তিনি সব রকম ব্যবস্থা করতেন।

একজন নেতার এমন মহানুভবতায় জেলখানার সকল শ্রেণির বন্দীর মুখে শফিউল বারী বাবু নামটি জনগণের সত্যিকারের নেতা হিসেবে উচ্চারিত হয়। জেলখানায় অনেক নেতা ছিলেন কেউ কারো খোঁজও রাখতেন না ।

আমি জেলখানায় গিয়েই সকলের মুখে আব্দুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল ভাইয়ের ব্যাপক প্রশংসা শুনতে পাই। তিনি চলে আসার পর বাবু ভাই জেলে যান। কর্মীর প্রতি একজন নেতার কি পরিমাণ ভালোবাসা থাকতে পারে তা শফিউল বারী বাবুকে জেলখানায় স্বচক্ষে না দেখলে বুঝতে পারতাম না।

অনেক জনদরদী নেতার নাম শুনেছি, তাদের জীবনী পড়েছি কিন্তু শফিউল বারী বাবু এক ও অনন্য। মধ্য বয়সীর একজন নেতা কি করে সর্বশ্রেণির নেতাকর্মীর এত ভালোবাসা দখল করতে পারে তা আমার কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছে।

সেবার ব্রুত নিয়েই রাজনীতির হাতেখড়ি শফিউল বারী বাবুর । দেশ ও জনগণের পক্ষে আজীবন কাজ করে যাওয়া শফিউল বারী বাবু ঢাকা কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায় শহীদ জিয়া প্রবর্তিত জাতীয়তাবাদী আদর্শ বুকে ধারণ করে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন।

তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর তার রাজনৈতিক গুণের জ্যোতির্ময় আলো সারা দেশের হাজার হাজার ছাত্রদের মধ্যে ছড়িয়ে পরে এবং তাদেরকে ছাত্র রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হন।

একজন শফিউল বারীর রাজনৈতিক গুণাবলী লিখে শেষ করা যাবে না। আমরা যারা একসাথে জেলখানায় ছিলাম তাদের মধ্যে আমি সহ কাজী ইফতেখায়রুজ্জামান শিমুল, মহিউদ্দিন লোবান, সরোয়ার ভূইয়া রুবেল, এইচ এম রাশেদ, আলমগীর কবির, এ্যাডভোকেট তাজুল, মোর্শেদ, রমিজ সহ অনেকের সাথে প্রতিদিনই ঘন্টার পর ঘন্টা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করতেন।

আরও পড়ুন: ভাস্কর মৃণাল হকের মৃত্যুতে জাসাসের শোক

মামুন, আলমগীর, রমিজ, সজল এবং আমাকে কাশিমপুর কারাগারে চালান করে দেওয়ার জন্য নিয়ে গেলে বাবু ভাই নিজে জেলগেটে গিয়ে চালান ঠেকিয়ে ছিলেন।

তারপর সবাই আমাকে বলেছিলেন, বাবু ভাই কারো জন্য এতটা উদ্বিঘ্ন হন নাই যতটা আপনার জন্য হয়েছিলেন। আমি এই ঋণ কোনো কিছুর বিনিময়েই শোধ করতে পারব না।

আমি আমার লেখা একটি বই বাবু ভাইকে দেওয়ার জন্য বাসায় গেলে তিনি সেই বইটি হাতে নিয়ে ছবি তোলার জন্য সাহাবউদ্দিন সাবুকে ছবি তুলতে বললে সাবু ছবি ভালো তুলতে না পারার জন্য সাবুকে মিষ্টি ভাষায় বকাও দিয়েছিলেন।

আজ এই স্মৃতিগুলি শুধুই স্মৃতি হিসেবে স্মৃতির মণি কোঠায় স্থান করে নিল।

রাজনীতি হচ্ছে মানবতার কল্যাণে এই উপলদ্ধি হৃদয়াঙ্গম করেছিলেন শফিউল বারী বাবু। তাই তিনি তার স্ত্রীকেও মানবতার কল্যাণে কাজ করার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। তার স্ত্রী অর্পণ বাংলাদেশ নামক সেবা সংগঠনের মাধ্যমে শত শত দুঃস্থ, অসহায় মানুষকে সাহায্য করে যাচ্ছেন।

এমন একজন নেতাকে হারিয়ে আমরা বাকরুদ্ধ। তার রেখে যাওয়া দুটি অবুঝ শিশু সন্তানের জন্য এবং তার বিদেহী আত্মার প্রতি শান্তি কামনাই প্রতিটি নেতাকর্মীর ব্রুত হওয়া উচিত। মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি, আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করে।

harun_980@yahoo.com

ফেসবুক পেজ লাইক করুন: https://www.facebook.com/Polnewsbd/
আমাদের টুইটার প্রোফাইল ফলো করুন: https://twitter.com/BdPolitical
ইনস্টাগ্রামে আমাদের ফলো করুন: https://www.instagram.com/polnewsbd/
ভিডিও দেখতে ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন: https://www.youtube.com/channel/UCB6tJwKVyYC9hs9nk5PSy3A?

Tags

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × 2 =

Back to top button
Translate »
Close
Close