কৃষক দলজাসাসমতামতযুব দলস্বেচ্ছাসেবক দল

সংবিধান : চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা

মঙ্গলবার ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০।। ১৪.৩০

মোঃ হারুন-অর-রশিদ

আমাদের রাষ্ট ব্যবস্থা একটি গণতান্ত্রিক অবয়বের মধ্যে বড় হওয়ার কথা। স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল স্পিরিটও তাই ছিল।

দেশের সংবিধানের ৩৯ ধারার (১) উপধারায় বলা আছে, ‘চিন্তা ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তাদান করা হইল।’

উপধারা (২) এ বলা আছে, ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে

কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপতি যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে (ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের, এবং (খ) সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।’

সংবিধান একজন নাগরিকের স্বাধীন চিন্তা ও বিবেকের জায়গাটাকে প্রসারিত করার অধিকার দিয়েছে।

কিন্তু রাষ্ট্র তার সংবিধানের এই ধারাকে উপক্ষো করে স্বাধীন চিন্তা ও বিবেকের গলায় বেড়ি পড়ানোর চেষ্টা করছে।

আরো পড়ুন: পক্ষ বিপক্ষ নাকি বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ

অনেক সাংবাদিক যারা রাষ্ট্রীয় দূর্নীতির চিত্র জনগণের সামনে এনেছে তাদের উপর রাষ্ট্রীয় নির্যাতন নেমে এসেছে। অনেককে জেলে যেতে হয়েছে।

রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলা যাবে না; এটা গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। এটা সরাসরিই সাংবিধানিক আইনের লঙ্ঘন।

পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে পৃথক হয়ে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম কারণ ছিল বাক স্বাধীনতার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।

আজ সেই অধিকারের গলায় যদি বেড়ি পড়ানো হয় তাহলে স্বাধীনতা সংগ্রামে যারা রক্ত দিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন, ইজ্জত-সম্ভ্রম হারিয়েছেন তাদের সাথে সুস্পষ্ট বেঈমানী ব্যতীত এটাকে আর কোন ভাষায় ব্যাখ্যা করা যাবে না।

চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতাকে রোধ করতে গিয়ে জাতিকে মেধাশূন্য করার এক রকম ষড়যন্ত্রমূলক প্রচেষ্টা হচ্ছে কিনা বিষয়টা এখনই ভাবার প্রয়োজন।

কোনো দেশের বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে মুক্ত বুদ্ধির চর্চার কেন্দ্র।

এখানে বিভিন্ন মত, পথ, দর্শন ও চিন্তা ধারার চর্চা হবে। এখান থেকেই বেড়িয়ে আসবে ইতিহাসের সত্য ঘটনা। যুগকে এগিয়ে নেবার জন্য বৈজ্ঞানিক সূত্র ও নতুন নতুন আবিষ্কার।

কেউ গবেষণা করতে গিয়ে সত্যকে লুকিয়ে রাখেন এবং আবার সেই লুকানো সত্যকে উদ্ঘাটনের জন্য আরেকজন আলাদাভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করতেই পারেন।

এখানে প্রতিহিংসার জায়গাটা খুবই ক্ষুদ্র।

এর জবাব হিসেবে শিখা পত্রিকার সম্পাদক আবুল হোসেনের সেই উক্তিটাই যথেষ্ট, ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ,বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’।

ভিন্নমত পোষণের কারণে কারো উপর শাস্তির বিধান গণতন্ত্রের কোন বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পরে তা জানা নেই।

এই বিষয়ে কোনো আইন থাকলেও সেই আইন সাংবিধানিক আইনের লঙ্ঘন বলেই আমি মনে করি।

ড. মোর্শেদ হাসান খান
ড. মোর্শেদ

২০১৮ সালে একটি জাতীয় দৈনিকে ‘জ্যোতির্ময় জিয়া’ শিরোনামে একটি লেখা লিখেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে, তিনি ওই নিবন্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কটূক্তি ও ইতিহাস বিকৃতি করেছেন।

মূলত ওই নিবন্ধে তিনি তার স্বাধীন মত প্রকাশ করেছেন।

তার লেখনীতে যদি ইতিহাসের বিকৃতি এবং কোনো ব্যক্তিকে কটূক্তি করার মতো কোনো ঘটনা ঘটেও থাকে তার একমাত্র জবাব দেওয়ার মত আরেকটি উত্তম উপায় হলো ওই নিবন্ধের বিরুদ্ধে আরেকটি নিবন্ধ প্রকাশ করা।

মুক্তিযুদ্ধের উপ-প্রধান সেনাপতি এ কে খন্দকারের প্রকাশিত ‘১৯৭১: ভেতরে বাইরে’ বইটি বাজেয়াপ্ত করার প্রস্তাবে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেছিলেন,

‘কোনো বইয়ের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে তাকে বাজেয়াপ্ত না করে অন্য একটি বই লিখে এর প্রতিবাদ বা ঘৃণা প্রকাশ করতে হবে ’(প্রথম আলো, ৫,সেপ্টম্বর,২০১৪)।

অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খানের বেলায়ও এমনটিই করা যেত। তা না করে তার চাকুরি কেড়ে নিয়ে সাংবিধানিক আইনের বরখেলাপ করা হয়েছে বলে মনে হয়।

এখানে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করার দরকার; বিশ্ববিদ্যালয় আইনে একজন শিক্ষকের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা কতটুকু।

বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ৫৬ ধারার ২ উপধারা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তার রাজনীতি করার তথা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে।

ওই আইনে একজন শিক্ষককে কি কারণে চাকুরিচ্যুত করা যাবে তাও উল্লেখ আছে। ৫৬ ধারার ৩ উপধারায় উল্লেখ আছে-

‘যদি তিনি নৈতিক স্খলনের মোরাল টার্পিচ্যুড) কিংবা দায়িত্ব পালনে অপরাগতার (ইনএফিসিয়েন্সি) অভিযোগে অভিযুক্ত হন তাহলে কেবল তার চাকুরি হারাতে পারেন।’

এখন প্রশ্ন হলো- মোর্শেদ হাসান খান এই দুই অভিযোগের কোনোটিতেই অভিযুক্ত হননি। কাজেই এটাই স্পষ্ট যে, তার স্বাধীন মত প্রকাশের কারণেই চাকুরিচ্যুতি হয়েছেন।

আরো পড়ুন: চারজন বিখ্যাত শিক্ষকের মত: ঢাবি শিক্ষক ড. মোর্শেদকে চাকুরিচ্যুতি খারাপ দৃষ্টান্ত

এটি দ্বারা প্রমাণিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়কে মত প্রকাশের যে স্বাধীনতা দেওয়া আছে তা খর্ব করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এখানে থেকে কেউ যাতে ভবিষ্যতে ভিন্নমত প্রকাশ করার সাহস না পায় তার প্রাথমিক প্রতিহিংসার শিকার ড. মোর্শেদ হাসান খান।

আজকে মুক্তবুদ্ধি চর্চার জায়গাকে যদি সংকীর্ণ করে ফেলানো হয় তাহলে জাতির কপালে কি অপেক্ষা করছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

জাতিকে মেধা শূন্য করার এই ভয়ঙ্কর প্রচেষ্টা রহিত করতে না পারলে সামনে আলোর পথ বন্ধ হয়ে অন্ধকার নেমে আসবে।

তবে সম্ভাবনার কথা হচ্ছে- টমাস ফুলার যেমন বলেছেন, আজকে ইতিহাস যেভাবেই লেখা হোক কোনো না কোনো এক সময় ইতিহাসের সত্যতা প্রকাশ পাবেই।’

তাই দলীয় রাজনীতির প্রতিহিংসার আগুনে কাউকে প্রজ্জ্বলিত না করে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে জাগ্রত রাখতে হবে।

এতে জাতির মুক্তির সম্ভাবনা আছে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও বাস্তবায়িত হবে।

আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন: https://www.facebook.com/Polnewsbd/

Tags

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × four =

Back to top button
Translate »
Close
Close