মতামত

“প্রেয়সীর শেষ চিঠি”

০১ এপ্রিল ২০২১।। ১৯.০০

মো: হারুন অর রশিদ

সবে বসন্তের শুরু। সন্ধ্যা নামে নামে এমন এক সময় বাড়ীর দক্ষিণ পাশের ফুলের বাগানে ফুটে থাকা শিউলি ফুলের শুভ্রতা আমার মনকে খুব বেশি করে আকৃষ্ট করতে লাগলো। মনে হচ্ছে ফুলের সুগন্ধি আর স্নিগ্ধতা আমার হৃদয়কে আলতো করে ছুঁয়ে যাচ্ছে। কী ! এক বর্ণহীন ভালোবাসাময় অনুভূতি আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে হৃদয় থেকে হৃদয়ে।

যখন সন্ধ্যা নেমে এলো ঘর থেকে কে যেন বাহিরের বৈদ্যুতিক বাতিটি জ্বালিয়ে দিল। বৈদ্যুতিক বাতির ঝলমলে আলোয় শিউলি ফুলের শুভ্রতা যেমন আরো শুভ্র হয়ে ওঠলো, তেমনি আমার হৃদয় গহীনে ভালোবাসাময় আবেগ চঞ্চলা হরিণার মতো নেচে গেয়ে ওঠলো। প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে অস্পর্শ এক ভালোবাসার বাতাস আমার আঠারো কুঠির ছিম ছিমে দেহ থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। কী যে সে এক অনুভূতি তা আজও আমাকে আন্দোলিত করে চলেছে।

সেই বসন্ত থেকে আজকের দূরত্ব খুব একটা কম হয়নি। বুড়ি হয়নি তবে মধ্যাহ্ন পার করে চলছি। আবেগ আর অনুভূতি সেই শুরুর বসন্তের মতই আছে। হঠাৎ ফটো এলবামে তোমার একখানা ছবি আমার দৃষ্টি এড়াতে পারেনি। বাম হাতের সব ক’টি আঙ্গুল প্রসারিত করে বাম গালের পুরো জায়গা দখল করে কনুইটুকু একটি গাছের ডালে ঠেস দিয়ে আকাশের পানে তাকিয়ে ছিলে। আমি তোমার সেই ছবি দেখে, কবিতার ছন্দে তোমাকে লিখে ছিলাম, আকাশে চাহিয়া, পরানো নাচাইয়া, অপরূপের শোভা দিয়াছো ছড়াইয়া, জলে ফোটা কলমী ফুলের মত। আহা! কী সুন্দর, আহা! কী সুন্দর।’

আরো পড়ুন: শাহবাগী বন্ধুরা, দয়া করে ভেবে দেখবেন

তুমি আমার এই কবিময় প্রতিভার প্রশংসাও কিন্তু কম করোনি। তবে আমি কবি হতে পারিনি। তুমি কি জানো? আমার কবিত্বের প্রশংসা করে তোমার সেই ঝর্ণা পেনের কাটা কাটা লেখা চিঠিটি কত যত্ন করে রেখে দিয়েছি আলমারির দেরাজে; যার চাবি শুধু আমার কাছেই আছে। আমি মাঝে মাঝেই সেই চিঠিটি খুলে পড়ি। কত প্রেমময় ছন্দ মাখিয়ে প্রশংসার ভাষা দিয়ে চিঠিটি লিখে ছিলে। এই শোন! তোমার মত এত প্রশংসা কিন্তু কেউ কখনো আমাকে করিনি। কত ইনিয়ে বিনিয়ে আমার গারো বর্ণে র ছিম ছিমে দেহের রূপের বর্ণনা দিয়ে কবি প্রতিভার প্রশংসা করে আমাকে কবি হতে বলেছিলে। কই! আমি তো আর কবিতা লিখতে পারলাম না।

তুমি কিন্তু ঠিকই একজন জাঁদরেল লেখক হয়ে ওঠেছো। তোমার অনেক লেখাই আমি পড়ি। তবে অনেক লেখার মধ্যে ঐ যে পাহাড়ি মেয়েটাকে নিয়ে লিখেছিলে ঐ লেখাটা আমাকে খুব আকৃষ্ট করেছে। তুমি তো এমন করেই আমাকে নিয়ে লিখতে। অবশ্য আমাকে নিয়ে কোন বই লিখোনি যা লিখেছো সব চিঠিতেই লিখেছো। তোমার চিঠি আমি খুব আদর করে রেখে দিয়েছি।

তুমি হয়তো ভাবছো, আমি তো সেই কবেই তোমোকে ভুলে গিয়েছি। তবে আজ কেনো এই চিঠি? তুমি হয়তো আমাকে ভুলে গেছো। আমি ভুলতে পারিনি। আমি অনেক অনেক করেই তোমাকে খুঁজে বেড়াই আমার দৃষ্টি যত দূর যায় সেখানেই।
এই শোন! আমি শুনেছি তুমি অনেক সুখে আছো। সত্যি না কি? তোমার সুখের জন্যই আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম। আর বলো না, আমার চোখের ঝাপসাটা একটু বেড়ে গেছে। ডাক্তার দেখাতেই বড় ফ্রেমের একটি পাওয়ারের চশমা দিয়ে দিয়ে দিলো। কী আর করা! এখন সেটিই পড়ে থাকি। তবে ড্রেসিং টেবিলের পুরানো সেই আয়নায় মাঝে মাঝে চশমা পড়ে যখন নিজেকে দেখি তখন খুব একটা খারাপ লাগে না।

আরো পড়ুন: “বিচার চাইবো কার কাছে”

তোমার একটি চিঠি পড়ে আমি খুব হেসেছিলাম। তুমি জানতে চেয়েছিলে, আমার ‘বর’ কী করে? তোমাকে আর উত্তরটা জানানো হয়নি। মনে পড়ে? তুমি একদিন আমার বুকের উপর মাথা রেখে বলেছিলে, ‘উদয় থেকে অস্ত পর্যন্ত আমি তোমারই।’ তারপর আর ‘বর কোথা’ থেকে আসে বলো?

তোমার কাছের এক বন্ধু আমার সাথে একদিন দেখা হতেই বললো, তুমি যাকে বিয়ে করেছো সে না কি দেখতে খুব সুন্দরী? হ্যাঁ, সুন্দরী তো হবেই তোমার চোখ চেয়ে এনেছে না! আর হ্যাঁ আমার কথা তুলতেই নাকি তোমার স্ত্রীর সামনে আমাকে তুমি চিনতেই পারোনি? কতদিন হয়ে গেছে বলো, আমার কথা কী আর মনে থাকার কথা। তবে আমি না তোমাকে ভুলতে পারিনি।

ধূলোয় ধূসর এই পৃথিবীর বুকে ফুটে থাকা সব সবুজই কি মালির পানির ছোঁয়া পায়? আমিও পাইনি। আমি হয়তো কোনো এক পাহাড়ের বুকে বেড়ে ওঠা একটি তৃণলতা। মানুষ কিছুক্ষণ তার শোভা নিয়ে চলে যায় কোনোদিন তার কথা আর মনেও রাখে না। যাই হউক কথায় কথায় অনেক কথা বলে ফেলেছি। তোমার ঐ বন্ধুর কাছে ঠিকানাটা পেয়ে মনে হলো একটু লিখি। তাই আর কী!

এটিই আমার শেষ চিঠি। তোমার উত্তরের অপেক্ষায় আর চেয়ে থাকবো না। তুমি যাকে নিয়ে সংসার পেতেছো তাকে নিয়ে সুখে থেকো। তোমার সুখের সংবাদ আমাকে উচ্ছ্বসিত করবে।

ইতি,
যে নাম তোমার মনে নেই।

ফেসবুক পেজ লাইক করুন: https://www.facebook.com/Polnewsbd/

আমাদের টুইটার প্রোফাইল ফলো করুন: https://twitter.com/BdPolitical

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen + 10 =

Back to top button
Translate »