মতামত

নিষ্প্রাণ রাজনীতি

১২ মে ২০২১।। ১৬.২৫

মো. হারুন-অর-রশিদ

কাউকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় আপনি কি রাজনীতি করেন? কিংবা কোন রাজনৈতিক দলের সাথে কি সম্পৃক্ত আছেন? ব্যক্তির উত্তর রাজনীতির ব্যাপারে ইতিবাচক বা নেতিবাচক যেমনই হউক না কেন মোদ্দাকথা তিনি রাজনীতির পরিসীমার বাহিরে নন।

এমন কি তিনি যদি রাজনীতিকে ঘৃণাও করেন তবুও তিনি রাজনীতির আওতার মধ্যেই থাকবেন। কারণ আমাদের ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সবকিছুই রাজনৈতিক নীতি দ্বারা প্রভাবিত ও চালিত।
রাজনীতি মানেই হলো নীতি- আদর্শের লড়াই।

একদল এটা মানে তো আরেক দল ঠিক তার উল্টোটা। উত্তেজনা, একে অপরের সমালোচনা, ভুল ত্রুটি খুঁজে খুঁজে বের করে জনগণের সামনে তুলে ধরাই হলো রাজনৈতিক দলগুলোর কাজ।
সারা দুনিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনের একই কাজ।

সাম্প্রতিককালে মিয়ানমারে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে সামরিক সরকার ক্ষমতা দখল করেছে। কিন্তু সেই দেশের জনগণ সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে চরম প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। প্রতিনিয়ত সামরিক জান্তার হাতে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী বহু মানুষের জীবন নিচ্ছে কিন্ত আন্দোলনের গতি তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।

এমনকি রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে জাতীয় সরকার গঠন করেছে। জনগণের আন্দোলন দিনকে দিন জান্তা সরকারকে বুঝিয়ে দিচ্ছে এখন আর অবৈধকে মেনে নেওয়ার কিংবা ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই।

জান্তা সরকার ভেবেছিল চোখ রাঙানি দিয়ে বা অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে জনগণকে ধামিয়ে দিয়ে তাদের পথ চলা মসৃণ করবে কিন্তু জনগণ তাদের সেই স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে।

দুনিয়ার যেখানেই জনগণের অধিকারকে হরণ করা হচ্ছে সেখানেই প্রতিবাদ, প্রতিরোধ গড়ে তোলা হচ্ছে।

ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। ২০১৪ সালে এবং ২০১৮ সালে পর পর দুই টার্ম একটি সরকার অবৈধভাবে জনগণের ভোটের অধিকারকে হরণ করে যতটা আরাম আয়েশে এদেশের মানুষকে শাসন শোষণ করছে তা পৃথিবীর কোন দেশের সরকারই এতটা আরাম আয়েশে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে না।

সংসদে সরকারী নামে একটি দল আছে কিন্তু বিরোধী দল বলে কোন অস্তিত্ব নেই। সরকার যা ইচ্ছা করে যাচ্ছে। প্রতিবাদ, প্রতিরোধ কোন কিছুই নেই। সরকারি দূর্নীতি আজ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে বলার কেউ নেই। দেখেশুনে মনে হচ্ছে সরকার ভয়ংকর সুন্দর বনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার আর বাকীরা ছাগল ভেড়া। ভয়ে পালাই পালাই ভাব। কখন যেন বাঘ ধরে বসে।

বর্তমান পৃথিবীর এক নিরুত্তাপ রাজনীতির উদাহরণ হচ্ছে বাংলাদেশ। এখানে একদলের শাসন-শোষণের যাতাকলে নিষ্পেষিত জনগণ কিন্তু প্রতিবাদ নেই। সরকারের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার কোন বা সংগঠনও নেই।

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মিথ্যা ও বানোয়াট মামলায় সাজা দেওয়া হয়েছে এটা খোদ আওয়ামী লীগের একজন কর্মীও জানে। কিন্তু তারা এই মিথ্যাটাকেই জনগণের কাছে সত্য প্রমাণ করার জন্য নিজেদের মুখকে যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করেছে। তাদের এই কাজ নোংরামি ও ইতর রাজনীতির অংশ হলেও তারা শতভাগ সফল।

তারা বেগম খালেদা জিয়াকে সাময়িকভাবে সাজা স্থগিত করার নামে শর্ত সাপেক্ষে কারাগার থেকে বের করে কার্যত ঘরে বন্দী করে রেখেছে। এটাকে সরকার করুণা করেছে মর্মে জনগণের কাছে বিভিন্ন আঙ্গিকে বলার চেষ্টা করছে।

আজকে তিনি গুরুতর অসুস্থ। তার উন্নত চিকিৎসার জন্য বাহিরে যাওয়ার প্রয়োজন হলেও সরকার তার অনুমতি দিচ্ছে না। সরকারের এই আচরণে বুঝাই যাচ্ছে খালেদা জিয়াকে তারা কারাগার থেকে বের করে গৃহবন্দী করে রেখেছে।

খালেদা জিয়ার স্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট: ডা. জাহিদ

এখানে সরকারের সুবিধা ৩টি এক.খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে মুক্ত করে তারা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে তারা কতটা উদার.

দুই. খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার জন্য ছিটে ফোটা যে দুই একটা মিছিল বা উত্তেজনা হতো তা রোধ করা গেল।

তিন. আন্তর্জাতিক বিশ্ব যাতে খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে কথা বলতে না পারে সেই মুখও বন্ধ করে দেওয়া গেল।

এটা তো গেল সরকারের সুবিধার কথা।

অন্যদিকে খালেদা জিয়ার দল বিএনপিকে পঙ্গু করে দেওয়ার একটা কৌশলও হলো এটা। এমনিতেই তো খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার মানসে বিএনপির তরফ থেকে বৃহত্তর কোন আন্দোলন এখন পর্যন্ত সংগঠিত হয়নি। আর এখন এটা সম্ভবও নয়। কারণ আন্দোলন করতে হলে যে সাংগঠনিক শক্তি ও শৃঙ্খলা থাকা প্রয়োজন তা এই মূহুর্তে বিএনপিতে নেই।

বিএনপির সমর্থক গোষ্ঠী পূর্বের তুলনায় বর্তমানে বরং বেশি কিন্তু সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে না থাকায় তাদের এই শক্তি কোন কাজেই আসছে না।

সাংগঠনিকভাবে বিএনপিকে দূর্বল করে দেওয়ার জন্য সরকার যেমন ফাঁদ ও কৌশল করে যাচ্ছে তেমনি নিজ দলের লোকেরাও সরকারের পেইড এজেন্টের দায়িত্ব পালন করছে বলে মনে হয়।

রাজপথকে উত্তপ্ত করতে না পারলে কোন অবস্থাতেই সরকারের কাছ থেকে কোন দাবী আদায় করা সম্ভব না। আন্তর্জাতিক বিশ্বও কোন ভূমিকা রাখবে না।

অত্যন্ত সুকৌশলে মাঠের রাজনীতিকে গৃহবন্দী করে ফেলেছে বিএনপি। মাঠের রাজনীতিকে চাঙা করতে হলে অঙ্গ সংগঠনগুলোর ব্যাপক ভূমিকা থাকে। কিন্তু দূর্ভাগ্যের বিষয় আজকে ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল যারা রাজপথকে প্রকম্পিত করে রাখে সেখানে শ্লোগান দেওয়ার লোকও এখন নেই। প্রশ্ন আসতে পারে কেন নেই?

এর জবাবও আছে। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে যারা প্রকৃত অর্থে মাঠের রাজনীতি করতো যাদের ত্যাগ, শ্রম এবং দলের প্রতি কমিটমেন্ট আছে তাদেরকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত না করে নিষ্ক্রিয়, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, বাড়ীর অফিসের চাকর বাকরের সমন্বয়ে কমিটি দিয়ে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলা হয়েছে।

অনেকে অভিযোগ করেন, রাতের আঁধারে যারা সুগন্ধি মেখে কোট টাই পরে খামসহ নেতাদের বাসায় হাজিরা দেয় তাদের জন্য পদ প্রাপ্তিটা সুগম হয়। এর অনেক দৃষ্টান্তও আছে।

হামলা- মামলা, জেল-জুলুমে নিষ্পেষিত, নিপীড়িত নেতাকর্মীরা যখন অমূল্যায়িত হয় তখন তারা মনে দুঃখ নিয়ে আর রাজনীতির দিকে অগ্রসর হননা। এতে করে সরকার যেমন সুবিধাপ্রাপ্ত হয় তেমনি দলের পেইডএজেন্টরাও সরকারের সুবিধা পেয়ে থাকে।

সরকারকে ফ্যাসিবাদ বলে গালি দিচ্ছে আবার নিজেরাই দলের কর্মীদের সাথে ফ্যাসিবাদী আচরণ করছে।

বাস্তবতা হচ্ছে বাঘ যখন বিড়ালের রূপ ধারণ করে শৃগাল তখন তার সব রকম চালাকি শক্তি ব্যবহার করে বাকীদের বোকা বানানোর চেষ্টা করে।

পরিশেষে বলতে চাই নিজেরা বাঘ এই সত্যটাকে না মেনে যদি নিজেরাই ছাগল বনে যান অন্যরা আপনাদেরকে গ্রাস করবে এটাই তো স্বাভাবিক।

রাজপথের মোকাবিলা রাজপথ দিয়েই করতে হয়। রাজপথের উত্তেজনা না থাকলে সাধারণ জনগণও ঝিমিয়ে পড়ে। নিরব নিস্তব্ধতা হয়ে বিলীন হয়ে যায় প্রতিবাদের ভাষাগুলো।

তাই বলি জেগে ওঠার জন্য জেগে ওঠতে হয়। বিছানায় শুয়ে জেগে আছি ভান করলে। কষ্মিনকালেও কোন সফলতা আসবে বলে মনে হয় না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one + eighteen =

Back to top button
Translate »